#ছায়া_মানব

#সাথী_ইসলাম
৭০.
অহনার জ্ঞান ফিরতেই সে পাশে মাহতিম এবং রুমিকে দেখতে পায়। অহনার জন্য খাবার আনতে রুমি চলে যায়।
অহনা মাহতিমের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। মাহতিম চোখ সরিয়ে নিতেই অহনা তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নেয়,' লুকিয়ে যাচ্ছ কেন? আমি কি তোমাকে চিনি? হ্যাঁ, আমি চিনি, কিন্তু বিশেষভাবে কি সেটা?'
অহনা নিজের হুঁশে নেই। সবকিছু আবছা দেখছে। পুনরায় বলল,' তোমাকে আমার এত কাছের মনে হয় কেন? কে তুমি? তুমিই কি আমার স্বপ্নে আসো?'
মাহতিম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,' আমি তোমার বর্তমান। আমাদের আগে কখনো দেখা হয়নি।'
' তুমি মিথ্যে বলছ। আমি সত্যিটা জানতে চাই।'
' আমি তোমাকে অনেকবার সত্যিটা জানাতে চেয়েছি কিন্তু তুমি শুনতে চাওনি, বিশ্বাস করোনি। এখন কেন জানতে চাইছ?'
অহনা স্মৃতির পাতাতে ডুব দেয়। পুরনো কথাগুলো কানে বারি খাচ্ছে। দুহাতে নিজের কান চেপে ধরে,
' কেন এসব আমার কানে বাজছে? আমি শুনতে চাইনা। মাহতিম কিছু করো। এসব কি হচ্ছে আমার সাথে? আমি মুক্তি পেতে চাই এই শব্দগুলো থেকে!'
মাহতিম অহনাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে,' কিচ্ছু হবে না তোমার, আমি আছিতো। আমি তোমাকে বার বার না করা সত্ত্বেও কেন তুমি ডায়রীটা পড়লে? আমি অনেকবার বলেছি এটা না পড়তে। এর জন্য‌ই তোমার সাথে এমনটা হচ্ছে।'
', এই ডায়রীটা কার? কেন এটা পড়ায় আমার সাথে এমনটা হচ্ছে?'
' তুমি আর কখনো এটা পড়বে না। পড়লেই মন খারাপ করবে।'
' তুমি বলো, এটা কার? আমাকে সবটা বলো, কারণ কি এই ডায়রীর?'
'আমি বলতে পারব না।'
অহনা মাহতিমকে ছেড়ে দেয়,
'ঠিক আছে, তুমি বলবে না তাই না? বলতে হবে না। তুমি যদি না বলো, তাহলে আর কখনো আমার সাথে দেখা করো না। কখনো আমার সামনেও আসবে না।'
', দু'দিন পর এমনিতেই আর খুঁজে পাবে না। অন্তত এই দুইদিন থাকতে দাও তোমার কাছে!'
' কি বলছ এসব? আমি এসব শুনতে চাইনি। তুমি আমাকে সত্যিটা বলো, আমি জানতে চাই আমার সাথে এসব কি হচ্ছে।'
' মাহতিম দীর্ঘক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,' তুমি সবটা জানতে চাও তাই না? আমি বলব, তার আগে এলবামটা দেখো। আমার মনে হয় না‌ এটা দেখার পর আমাকে আর কিছু বলতে হবে।'
মাহতিম ছবির এলবাম এগিয়ে দেয় অহনার দিকে। তার উদ্দেশ্য, অহনা সবটা জেনে গেলে হয়তো সে বুঝবে। মাহতিম চলে যাওয়ার কারণ‌ও বুঝতে পারবে। আরিশকে মেনে নিয়ে সুখে থাকবে।
অহনার হাতে এলবামটা ধরিয়ে দিয়ে মাহতিম বাইরে তাকিয়ে থাকে।
অহনা এলবামের প্রথম ছবি দেখেই শক খায়। মাহতিমের দিকে একবার তাকিয়ে আবার পরের পৃষ্ঠা দেখে। প্রতিটা পৃষ্ঠায় নিজের আর মাহতিমের এত এত ছবি দেখে অবাক হয়ে যায় অহনা। মাহতিমকে জিজ্ঞেস করে, ' আমিতো কখনো তোমার সাথে এত এত ছবি তুলিনি। এসব আসলো কি করে? এই জায়গাগুলোও অচেনা। তবে চিনি মনে হচ্ছে। কেন জানি না মনে করতে পারছি না। চুপ করে আছ কেন?‌ বলো এসব কিভাবে এলো?'
মাহতিম চুপ করেই র‌ইল। কোনো কথা বলল না। অহনা আবারো পরের ছবিগুলো দেখে। এত এত দুষ্টুমিষ্টি ছবি দেখে নিজের অজান্তেই হেসে উঠে। মনে খটকা লাগে ওর। ভীষণ চেনা মনে হচ্ছে। তাও বুঝতে পারছে না। কিভাবে এসব এলো।
অহনা ভাবতে থাকে। বিভোর হয়ে ছবিগুলো দেখে আর ভাবে। মাথায় প্রচন্ড ব্যথা করতে থাকে‌। নিজেকে আর সামলে রাখা যাচ্ছে না। দুহাতে মাথার চুল খামচে ধরে,
' এসব কি হচ্ছে মাহতিম? তুমিতো আমার সাথে ছিলে তাই না? আমার কি হচ্ছে এসব?'
রুমি খাবার নিয়ে আসার সময় মতি তাকে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। আজকাল বড্ড খাপছাড়া হয়ে গেছে এই মতি। যখন তখন সে রুমির জন্য ব্যাকুল। কাছে পেতেই দুহাতে জড়িয়ে ধরে। প্রশান্তিতে শরীরের ঘ্রাণ নেয়। হাতে থাকা খাবারটাকে এক পাশে রাখতেই রুমি বাঁধা দেয়,' এটা অহনার খাবার, ওর জন্য নিয়ে যাচ্ছি।'
' ভাইকে দেখেছি অহনার ঘরে যাচ্ছে। এখন খাবার দিলেও খাবে না। আগে একটু প্রেম করুক তারা। তুমি গেলে তাদের ডিস্টার্ভড হবে। তুমিতো আমাকে সুযোগ দাও না। ভাই আর অহনাকে দেখো, ওরা এখন প্রেম করবে। চলো, আমরাও করি।'
রুমি সাঁয় দেয়। মতি খুশিতে গদোগদো হয়ে উঠে। সে ভাবতে পারেনি রুমি তার কথা মেনে নেবে।
এক ঝটকায় রুমিকে টেনে এনে নিজের সাথে জড়িয়ে নেয়। কোমর চেপে ধরে বলল,
' আমি যা চাই তুমিও কি তা চাও?'
' আপনি কি চান?'
মতি রুমির কপালে কপাল ঠেকিয়ে বলল,' যা চাই আরকি, তুমিও কি চাইবে তেমনটা?'
' আমি বুঝতে পারিনি। ঠিক কি বলছেন?'
' সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। চলো এই সময়টা উপভোগ করি। আমার ইচ্ছে করছে খুব। ভাইয়ের বিয়ের পরেই তোমাকে বিয়ে করব।'
' পরিবার মেনে নেবে?'
' অহনার মতো মিডেল ক্লাস মেয়েকে মেনে নিলে তোমাকে তো হাজারবার মেনে নেবে। আমাদের দুজনের মধ্যে কোনো বাঁধা থাকার কথা না।'
' অহনার মত মেয়ে মানে? আপনি কি বলতে চেয়েছেন?'
রুমি মতির থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়,
' নিজেকে অনেক বড় মানুষ মনে করেন তাই না? এটা যেদিন বাদ দেবেন সেদিন‌ আমার সাথে দেখা করবেন! আর শোনেন, আমিও আপনাকে পছন্দ করি খুব। তবে আপনার লম্বা লম্বা পা দেখে না, আপনার পরিবর্তন দেখে। প্রথম থেকেই আপনাকে আমার বিরক্ত লাগতো। কিন্তু পরিবর্তন দেখে ভালোবাসার জন্ম নিয়েছে।'
' আমি এমনটা বলিনি। আচ্ছা, সব বাদ। আমি তোমাকে ভালোবাসি, এটাতো বিশ্বাস করো? তাহলেই হবে। তুমি বললে আজকেই সবাইকে বলে দেব, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।'
' লাগবে না। এখন না বলে পরে বলবেন, আগে নিজেকে গুছিয়ে নেন। যার মধ্যে বিলাসীতা থাকবে তাকে আমি মেনে নেব না।'
মতি মাথা নুইয়ে নেয়। লজ্জাবোধ তাকে আকড়ে ধরে। ক্ষমা চেয়ে নেয় রুমির থেকে।
শেষের ছবিগুলো দেখেই অহনা আঁতকে উঠে। পুরনো সময়, জায়গা এবং মুহুর্তগুলো সব মনে পড়ে যায়। চোখ দুটো অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠে। ছবিটাতে হাত বুলিয়ে দেয়,' আমার মাহতিম, কত জায়গায় খুঁজেছি আমি তোমায়। কেন আগে দেখা দিলে না?'
অহনা পাশে থাকা মাহতিমের দিকে তাকায়। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে ঝাপটে ধরে। কান্নারত অবস্থায় বলে,' আমার সব মনে পড়ে গেছে। তুমিই আমার মাহতিম। এতোদিন বললে না কেন তুমিই আমার সেই মাহতিম? কেন বলে দিলে না তুমি ফিরে এসেছ? এত অপেক্ষা কেন করালে?'
হুঁ হুঁ করে কেঁদে উঠে অহনা। মাহতিম চোখের জল লুকিয়ে রাখতে পারল না। নিজেও কেঁদে দিল,
' আমি তোমাকে সব জানাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি জানতে চাওনি। আজ ভুল সময় সব জানলে। আমি এটা চাইনি। এবার তুমি আরো কষ্ট পাবে। কিন্তু সত্যিটা জেনে আমাকে ছাড়তে তোমার কষ্ট হবে না।'
'এসব কি বলছ? তুমি কোথাও যাবে না। আমি পুনরায় হারাতে চাই না।'
অহনা কোনো কথা শুনতে নারাজ। মাহতিমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। ছেড়ে দিলেই হয়তো পালিয়ে যাবে, তাই ছাড়তে অনিচ্ছুক।
এক পর্যায়ে বলল,' তুমি জানো, আমি কতটা অপেক্ষা করেছি তোমার জন্য। আমার বিশ্বাস ছিল তুমি ফিরে আসবে। আমাকে বিয়ে করবে তুমি। সে আসায় আমি অপেক্ষা করেছি বিয়ের বেনারসী পড়ে। তুমি আসোনি, তুমি আসোনি আমার কাছে। কোথায় চলে গিয়েছিলে? আসতে এত দেরি করলে কেন? তুমিতো জানতে, আমি তোমাকে ছাড়া ভালো থাকব না। কোথায় ছিলে এতদিন? এতটা সময় কেন দূরে থাকলে?'
মাহতিম কেঁদে উঠে,
' তোমাকে ছাড়া আমি কি করে ভালো থাকি। তাইতো আবার ফিরে এলাম। কিন্তু আমাদের গন্তব্য এখানেই শেষ। তোমাকে মেনে নিতে হবে, আমি আর বেশিদিন নেই। খুব শিঘ্রই চলে যাব। চাইলেও আর ফিরে আসতে পারব না।'
অহনার বুকের ভেতরটা ধ্বক করে উঠল,' আর বেশি দিন নেই মানে? আমি তোমাকে দ্বিতীয়বার হারাতে চাই না। একবার হারিয়ে যতটা কষ্ট পেয়েছি, এবার হারালে হয়তো ম'রেই যাব।'
' অনেক আগেই হারিয়ে ফেলেছ। আমি জীবিত ন‌ই। পৃথিবীতে আমার কোনো অস্তিত্ব নেই। তোমাকে সেটা মেনে নিতে হবে।'
' আমি বিশ্বাস করি না। তুমি আর কখনো এমন কথা বলবে না।'
'‌ এটাই সত্যি।'
মাহতিম একে একে সব কথা বলল অহনাকে। বিশ্বাস করতে অনিচ্ছুক সে। ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠে,
' না, আমি ছাড়ব না তোমাকে। তুমি আমার হয়েই আমার কাছে থাকবে। আমি সব হারিয়েছি, তোমাকে হারাতে চাই না। এই বিরহ আমি মেনে নিতে পারব না। তুমি আমার থেকে আলাদা হতে পারবে না।'
দুজনে অঝোড়ে কেঁদে উঠে। কষ্টে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। চারিদিকটা শূণ্য লাগছে।
মাহতিম দুহাতে আরো শক্ত করে ধরল অহনাকে,' আমাদের যাত্রাটা আর একটু দীর্ঘ হলে কি হতো? কেন এ জীবনে বিচ্ছেদ লেখা ছিল? আরকি কোনো পরিণতি হতে পারেনি।'
', আমার কষ্ট হচ্ছে খুব‌। তুমি ছেড়ে যাবে না আমাকে। যেভাবেই হোক আমি ফিরিয়ে আনব তোমাকে।'
' কি করবে তুমি? কিছুই সম্ভব নয়।'
অহনা চোখ মুখ মুছে বলল,' আমি শুনেছি ইভিল স্পিরিটের মাধ্যমে প্রাণ ফেরানো যায়। আমি তোমার প্রাণ ফিরিয়ে আনব এর মাধ্যমে। আমি হারাতে চাই না তোমাকে! যে করেই হোক, আমার তোমাকে চাই।'
আরিশ দরজার আড়াল থেকে পুরো বিষয়টা দেখল। অহনার স্মৃতি ফিরে আসায় সে খুশি হতে পারল না তবে দুঃখ‌ও পেল না। চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। দুহাতের পিঠ দিয়ে তা মুছে নিল। ভালোবাসার পূর্ণতা দেখতেও ভালো লাগে।
ভালোবাসা মানে এটা নয় যে তাকে পেতেই হবে। ভালোবাসা হলো, প্রিয় মানুষটি যেখানেই থাকুক, যার সাথেই থাকুক, সে যেন সুখে থাকে।
আরিশ ইভিল স্পিরিটের কথা শুনে ঘরে ঢোকার সিদ্ধান্ত নিল। গলা খাঁকারি দিতেই অহনা আর মাহতিম নিজেদের সামলে নেয়।
আরিশ ঘরে ঢুকেই বলল,' অহনা ঠিক বলেছে। আমিও ইভিল স্পিরিট সম্পর্কে জেনেছি। বলতে গেলে অনেক আগে থেকেই জানি। আপনি এর মাধ্যমে নিজের শরীরে প্রাণ স্থাপন করতে পারেন। তবে একটা সমস্যা রয়েছে...
চলবে....